Friday, 2 December 2016

শান্তনু ব্যানার্জীর গল্প




            লিপস্টিক ডিওডোরান্ট

ফ্লাস্ক থেকে দুকাপ চা বার করে ফ্লাস্কটা বন্ধ করতে করতে আমাকে উদ্দেশ্য করে অর্ক বলল- “আচ্ছা বল তো ডিওডোরান্ট বলে কারোর নাম হতে পারে?” আমি তো শুনে থ! বললাম, ডিও, মানে ডিওস্প্রে ? কি সব যাতা বলছিস ? এখন মজা করার সময় তোর ?” আমার কথা শুনে হাসতে হাসতে এক কাপ চা আমার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে ও বলল তোর মৈনাক নামটা যদি আমার আর জ্যেঠুর কাছে মানিকচাঁদ হতে পারে, তবে সেটাও কেন হবে না? এই নে চা খেতে খেতে ঘটনাটা মন দিয়ে শোন, জানি গত দুদিন ধরে অপেক্ষা করছিস!” আমি এতক্ষণ যেন এই কথাটা শোনার অপেক্ষাতেই ছিলাম। দেওয়াল ঘড়িতে রাত্রি নটা বাজতে পাঁচ। আজকেও প্রায় একঘণ্টা ধরে আমাদের এ অ্যান্ড এম কন্সালটেন্সীর অফিস ঘরে অপেক্ষা করে বসে আছি ওর জন্য, অথচ বাবুর কোন পাত্তা নেই। আজ বুধবার, গত দুদিন ধরে প্রত্যেকদিন আমি অফিস থেকে ফিরে আমাদের চেম্বারে এসে আমি একা একাই ধূপধুনো দিয়ে ফিরে গেছি, বাবুর কাজের চাপে এখানে আর আসা হয় নি। আমারই দেওয়া একটা কেসের তদন্তে বাবু এখন ভীষণ ব্যস্ত, তাই আমার সাথেও কথা বলা বা দেখা করার সময় নেই।

তপন দাস

হাইকু

১.
প্রকাশ্য হত্যা
ঘর সামলে নিজে
বাঁচি অগত্যা

২.
পৃথিবী ঊষ্ণ
যুদ্ধেই মাতোয়ারা 
হায়! শ্রীকৃষ্ণ


Thursday, 1 December 2016

দেবব্রত সান্যালের - আজব ভাবনা


                                             
                      আজব-ভাবনা


(১) একটি তৈলাক্ত স্বপ্ন

তিস্তা বেসিনে প্রাকৃতিক গ্যাস খুঁজে পাওয়ার পর থেকে জলপাইগুড়ির চারুচন্দ্র আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে বিদেশী যাত্রীর ভীড় বেশ বেড়ে গিয়েছে। তাছাড়া পর্যটকদের চাপের জন্য করলার হাউস বোটে আজকাল বুকিং পাওয়া মুশকিল। আমি অবশ্য ফ্লাইট ধরব না। কলকাতা থেকে বুলেট ট্রেনে লাগে আড়াই ঘন্টা। কালো নুনিয়া চালের ভাতের সাথে কই মাছের গঙ্গা যমুনা আর বেলাকোবার চমচম খেতে খেতেই পৌঁছে গেলাম। 'চায়ে চুমুক' বলে একটা নতুন ছবি দেখাচ্ছিল। এখন বেশীর ভাগ ছবিই এদিকে তোলা হয়। ময়নাগুড়ির জয় জল্পেশ্বর ষ্টুডিও তো আজকাল হলিউডের সাথে পাল্লা দিচ্ছে। স্পিলবার্গ , ক্যামেরুন, এরা তো আর এমনি দৌড়া দৌড়ি করছে না। আরেকটা প্রবণতা দেখছি , সাউথ থেকে প্রচুর রোগী আসছে জলপাইগুড়ি মেডিকাল কলেজে চিকিৎসা করাতে ।

সোমাদ্রী সাহার গল্প

মিথ্যার পরে
নবগোপাল বাবুর ক’দিন ধরেই কোনও কাজকর্মে তেমন মন নেই। সকালে বাজার যাওয়া ও বাড়ি ফেরার পথে কু মনের মধ্যে ডাকে, হোচট খেয়েছে দু’দিন। নোটের দুর্দিনে কোনও ক্রমে পোনা মাছের ঝোল দিয়ে খেয়েই নবান্নের দিকে দৌড়। অফিসে লেট তো হয়, ঐ মিথ্যা বলেই এখন ম্যানেজ দিতে হয়। তবে কেরানীর চাকরিতে নবগোপালবাবু ঢুকেছিল তেইশ বছর আগে। সেই সময় ছেলে মেয়ে দু’জনেই সবে নার্সারির গন্ডি পেরিয়েছিল। তখন আর এখন বিস্তর পরিবর্তন হয়েছে।
সোনারপুরে আড়াইখানা এক এঁদো গলির ঘরে ভাড়া থাকে স্ত্রী-ছেলেমেয়েকে নিয়ে। তবে জিনের মধ্যে নবগোপালের রয়েছে মিথ্যা আর সাথে রয়েছে পেট খারাপ, বদহজম, জলের সমস্যা, মুদি দোকানে ধার, খুঁটিনাটি নিয়ে পাশের ভাড়াটের সঙ্গে ঝগড়া। তবে এখন স্মার্ট যুগে অনেক মিথ্যাই ধরা যায়। বৌয়ের যে কত মিথ্যা ছেলে-মেয়েকে উড়তে দেওয়ার জন্য তার কিছুই নবগোপালের মাথায় ঢোকে না। আজকাল ছেলেমেয়ের ব্যাপার-স্যাপারগুলো একদম মেনে নিতে পারছেন না। সারাদিন স্কুলে কাটানো ছাড়াও সকাল-সন্ধে প্রাইভেট টিউশন। ফিরে এসেই টিভির সামনে বসা। টিভি মানেই আশি নব্বইটা চ্যানেল। সিনেমা-পানপানানি সিরিয়াল-কার্টুন-খেলা-ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ।  নবগোপাল বুঝে পান না ওরা নিজেরা পড়ছে ও কখন নিজেরা শিখছেই বা কী। টিউশনের নোট নির্ভর জ্ঞান। টুকলি তো রয়েছে চুপকথায়। খালি মিথ্যা অজুহাত দেয় রেজাল্ট খারাপ হলে। দু-একবার নিজে পড়া ধরতে গেলেও ছেলেমেয়েরা বাপমায়ের কাছ থেকে শিখতে নারাজ। মিথ্যার গাছ। বাবা টাকা দেবে আর মা দেবে খেতে, এই গন্ডি পেরলেই মুখ হাড়ি। গায়ে হাত দিলে চুড়ান্ত মিথ্যার নাটুকে অশান্তি।

Wednesday, 30 November 2016

অদিতি চক্রবর্তী

শীতের সালতামামি
শীত জমেছে নকশিকাঁথায়, শীত জমছে গানে
শীত কমাতে হাবুল,টুবাই রোজকার কাকস্নানে
শীত জমিয়ে কড়াইশুঁটির শরীরখানি খাসা
কমতে থাকে শীতের গতর ঢুকলে লেপের বাসা।
শীত জাগলে পশমী নরম উলের গোলা কমে
হলুদ গাঁদার ভালোবাসা জমাট সরগরমে
বারান্দাতে শীতকাতুরে বুড়োর খিটিমিটি
দাওয়ায় বসে ফুলবড়িরা শুকিয়ে নিচ্ছে পিঠ-ই।
পুলিপিঠের খেজুর রসে দারুণ হুটোপুটি
পরীক্ষা শেষ, টুবলু পেলো বড়দিনের ছুটি
বাগানজুড়ে পরীরানির রংবেরঙ এর পোষাক
ইশানকোনের নীল ফুলটার লাল হয়েছে নাক।
উনুন,কড়াই বেজায় দেমাক,ও বলে আমায় দেখ
কালিয়া আর শুক্তানিতে ধনেপাতা ঝিনচ্যাক
শীত কাঁপছে, শীত লিখছে শীতের সাতকাহন
দাদুর এমন হাঁপের ব্যামো প্রাণ জানি যায় কখন!
দীপার ফোনে শীত বসেছে,রিংটোন তাই কুল
পার্কে প্রেমের হাটের তুফান বেঞ্চও হাউসফুল
দুইটি কেবল হলুদ পাতা শীত ধরেছে গা'য়
শূজনি,কাঁথা রোদ সেঁকছে, রাত খেলবে তায়
জিভের আগায় শীতের কামড়, কমলা তোকে চাই
ফি-রোববার চড়ুইভাতি খাচ্ছি দমে তাই
আগুন পোহায় রাখাল বালক তাপ্পিমারা জামা
সব লেখা শেষ দোহাই ও শীত এবার কলম থামা।

সুচেতা বন্দোপাধ্যায়

    চাঁদ (1)
তোমার দেখা আমার সনে
অবগুণ্ঠন অন্তরালে,
একটুখানি লুকিয়ে দেখি,
জানলার গায়ে মেঘ সরে যায়,
লোহার শিকে ঝুঁকে থাকা চাঁদ
ধরা পড়ে যায়---হঠাৎ।
ইসসশ.....কি লজ্জা কি লজ্জা...
বাসর জাগবে চাঁদ, আমাদের সাথে ফুলের শয্যায়......


চাঁদ (2)
তোকে কালো কালো গাছের ফাঁকেই মানায় ভাল।
জানলা গলে বলতে আসিস,"টুকি"।
জোছনা ধারা গড়িয়ে নামে আকাশবুড়োর গা বেয়ে,
তুইও নামিস.....মারতে উঁকিঝুঁকি।
আমার সাথে খেলবি লুকোচুরি?
তাহলে আজ ছাদেই কাটাই রাত।
কিন্তু যখন "সে" আসবে ঘরে,
অ্যাই দুষ্টু! চুপটি করে মুখটি ঢেকে রাখ!
 চাঁদ(3)
দূরবীনেতে চোখ রেখেছি আজ।
থাকবি দূরে? সে সাধ্য তোর নেই।
আজকে আমি মুঠোয় ধরব তোকে,
আনব টেনে তালগাছটার গায়ে।
দেখব চেয়ে, কি আছে তোর মুখে।
তোকে নিয়ে কাব্য কেন এত?
হাসির বন্যা জ্যোৎস্না হয়ে ঝরে,
তুই তো রে চোর! চুরি করিস ঘুম,
দেখলে তোকে ছন্দ এসে পড়ে...

Monday, 28 November 2016

আজিজ আহমেদের গল্প

বিস্‌মিল্লাহ্‌



শীতের শেষে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা ছেয়ে আছে চারিদিকে, এই সকাল বেলাটায়পাহাড়ের কোলের এই গ্রামটাতে তো আরো অনেক বেশিমনে হচ্ছে কোনো চিত্রকারের তুলিতে আঁকা স্বপ্নালু এক ফোটোফ্রেম। প্রকৃতির কোলে সঁপে দেওয়া এক নিরব, বিচ্ছিন্ন নীল আকাশের নিচে গরীব একটা গ্রাম। সুন্দর একটা গ্রাম। কাবুল থেকে প্রায় দেড়’শ কিলোমটার দূরে জালালাবাদের এই গ্রামটাতে খুব বেশি বসতি নেই। নেই জীবনের ব্যস্ততাও। তাই বোধহয় এত শান্ত, এত স্নিগ্ধ। চারিদিক সবুজ ঘাসে ঢাকা পাহাড়ের পাদদেশ, দূরে সূর্যের আলোয় মুক্তর মতো জ্বলতে থাকা হিন্দুকুশ পাহাড়ের শিখরে দুধ-সাদা বরফ, আর দূ্ষণমুক্ত স্নিগ্ধ শীতল বাতাস এক অপরূপ রোমাঞ্চ জাগিয়ে চলেছে বিস্‌মিল রুকসাতের মনে। গত পোরশু থেকে। এই গ্রামেতে বিয়ে হয়ে এসেছে সে দুদিন আগে। তিন কিলোমিটার দূর, এর পাশের গ্রামেই তাদের গ্রাম, তবে তার শ্বশুরবাড়ির এই গ্রামটার মতো এত সুন্দর নয়। বিস্‌মিলের মন চাইছে ভীষণ খুশি হতে কিন্তু মস্তিস্ক বাঁধা দিয়ে চলেছে অবিরাম। এই ঘরে আসার পর থেকে সে তার স্বামীকে দেখে নি এখনো। শুনেছে, নাকি শহরে গেছে কোনো কাজে। তবে অজানা তো ছিল না তার কিছুই।