Sunday, 27 November 2016

শুভাশিস আচার্য


বঁড়শী  দিয়ে মাঝদুপুরে। 




ঠেক বসেছে শুক্রবারে প্রথম ভাগ প্রকাশিত হবার পরপর চারিধারে বিপূল সাড়া পরে গেছে। সকলেই লেখকের ধরমুণ্ড কী করে এক আছে এখনো সেই প্রশ্নে এক মত হতে পারেননি। ঠেকের ভাষার মধ্যে অর্থ খোঁজা ভালো কিন্তু এই ভাষার যে বিপূল দিগন্ত বিস্তৃতি ব্যবহার,  ‘ভারসেটাইল’ যকে বলে সেদিকটায় কেন আলোপাত করা হয়নি এ নিয়ে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে অশেষ আলোচনা চলছে। নিচের  চিঠি তারই একখানি ছুঁচালো নিদর্শন। যা কুটকুট করে ফুটে চলেছে সর্বক্ষণ।  চিঠিটি এইরকম:
স্নেহচরনেষু শুভাশিস,
(এটাকে আবার আপনাকে খিল্লি ভাববেন না, এই সন্মোধনে ঠেকোচিত সন্মান আর স্নেহ দুইই টপ টপ করে ঝরে পরে) ঠেক বসেছে শুক্রবারে পড়ার পর এই চিঠির অবতারণা। তাড়া করেছে বলাই ভালো। প্রথমেই বলি, ঠেক শুধু কেন শুক্রবারে বসতে যাবে? আমাদের এখানে তো রোজ রোজ ঠেক বসে। যেমন রোজ ভাত খাই তেমনি রোজ ঠেক বসাই। তাই আপনার লেখার শিরোনামেই কিছু পরিবর্তন এর পরের সংখ্যায় আশা করি।  এরপর খেয়াল করলাম আপনি ঠেকের শব্দাবলীর যে অর্থ করেছেন তাতে সব জায়গায় সহমত হতে পারলাম না। যেমন ধরুন ঘ। ঘ য়ে ঘ্যাম ভুল নয়। কিন্তু কিছুদিন আগেই যে সর্বভারতীয় ঠকানো সন্মেলন  বসেছিল, আরে না না ঠেক সন্মেলন বসেছিল তাতে ঘ এ ঘেঁটে যাওয়াকে বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আপনার নিশ্চয় অজানা নেই যে কালে কালে আমরা সর্বদা তালে তালেই চলতে চাই। তাই ঘ্যামের পাশে আপনাকে একটু  ঘেঁটে যেতেও হবে। তাই  তো আমরা বলি ঘেঁটে ঘ, ঘেঁটেল পাবলিক, ঘেঁটেল মাল ইত্যাদি। পরের সংখ্যায় তাই আপনার কিছু লেখার আগে এই ঠেক ঘোরা সর্বহারার সবান্ধবদের কথা বিচার করে দেখার অনুরোধ রইল।
ইতি
স্বঘোষিত বিখ্যাত এবং সবার শ্রদ্ধেয় ঠেকু।




এইরকম চিঠি আরো পাওয়া গেছে। কী ঘোর বিপদ বলুন তো! এদের জ্বালায় দুকলম লিখেও শান্তি নাই।  এখন তো অবশ্য ঘুমিয়েও শান্তি নেই। কে কখন পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়। কাল থেকে তালা আর শেকল পায়ে বেঁধে রাতে শোব। সে যাই হোক।  আগের দিন আপনি যখন শেষটা না শুনে চলে গেলেন (পালিয়ে বাঁচলেন আপনার কথায়)  তখন ঠিক করলাম,  যে পরের বর্ণমালা নিয়ে কাজ করা থেকে বিরত থাকব না। সে আমাকে লোকে যতই সাবধান করুক। বলুন, লোকের আবার দাম আছে না কি?  অনেক অপ্রাসঙ্গিক কথা হোল, এবার আলোচনায় আসি।  যে বর্নমালাগুলো এবার আলোচনা করব তা হোল:
চ এ চামচ আর ছ এ ছড়ানো
জ এ জালিবাজ, ঝ এ ঝিঙ্কুগো।
চ এ চামচ
সকলেই জানেন যে এ চামচ সে চামচ না। এই চামচ হল চামচা বা চাটুকারিতার ছোট রূপ।  চামচ কথাটা তাই দেখা গেছে ঠেকের মধ্যে এই এক অর্থেই ব্যবহার করা হয়। যেমন ধরুন সেই সুকুমার রায়ের  গল্পটা যদ্দুর
মনে পরছে এমন ছিল যে, একটা ছবি এসেছে বাবুর বাড়ীতে কলকাতা থেকে, বাবুর ছবি। তা আসার পর বাবুর সমস্ত কর্মচারীরা কে কত বেশী চিনতে পেরেছেন কতটা বাবুর মতো দেখতে হয়েছে তার নিখুঁত  বর্ণনা  করতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর বাবু বলেন, কলকাতা থেকে খবর এসেছে যে অন্য কারুর ছবি ভুল করে চলে এসেছে। ব্যস। সকলে আবার ঠিক যা বলেছিলেন ঠিক তার উলটো কথা বলতে শুরু করলেন। এরা হলেন চামচ। এদের একটা বিষয় আর অভিমুখ জানালেই হল। এ প্রসঙ্গে বলি প এ পাল্টি  জানবার সময়ও এ গল্পটা কাজে লাগবে বুঝতে।  এখানে বলে রাখি চাটুকারিতার যেকোন উদাহরণেই আপনি এই আধুনিক ভাষার ব্যবহার করতে পারেন।
এখানে বলে রাখি অনেকেই মনে করেন চ এ চামচ না হয়ে চাপ হবে। এখানে  চাপ অর্থে টেনশান বা সংকট হতে পারে বা চাপ কথাটা অনেক সময় যারা খুব চিন্তায় আছে সেই চিন্তাকেও চাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আমি চ এ চাপ এর পক্ষে বা বিপক্ষে নই। তবে শোনা যায় চাপ দিয়ে চামচকে রোখা যাবে না। কথায় আছে না,  চাপ নিস না।
ছ এ ছড়ানো
এখানে ছড়ানো শব্দটাকে  কিছু ভুল করা অর্থে বোঝানো হয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবে কিছু  সকলের মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার  অর্থে যে ছড়ানো এখানে তা নয়। যেমন ধরুন বিধানসভা বা পার্লামেন্টে কেউ একজন দলিলপত্র রেগে গিয়ে ছুঁড়ে দিলেন আপনি কিন্তু বলতে পারবেন না অমুক মন্ত্রী আজ ছড়িয়েছেন। কিন্তু ধরুন সেই মন্ত্রী সেই কাজটা অন্যায় হয়েছে মানছেন না। তখন আপনি বলবেন উনি ছড়াচ্ছেন। এখানে বলে রাখি এই শব্দগুচ্ছের সাথে আমরা এখন সংখ্যা জুড়তে শুরু করেছি অর্থকে আরও অর্থবহ করতে। সম্ভবত শিবরাম চক্রবর্তীর সেই অঙ্ক সাহিত্যের যোগফল দিয়ে এর শুরু। এরপর থেকেই আমরা বলি ছড়িয়ে ছত্রিশ করে দিল দেখলে,  চাপে চুয়ান্ন হয়ে আছি বস ইত্যাদি।
এবার জ এ যাই।
জ এ জালিবাজ
জালিবাজ শব্দটা মনে হয় ভুল। ধান্দাবাজি থেকে ধান্দাবাজ কিন্তু জালিয়াতি করা থেকে জালিবাজ আসে না। ঠেক বিশারদরা এ  ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। আজকালতো আবার আলোচনায় হয়, সিদ্ধান্ত কিছু দেখিনা। সে যাই হোক।  এই জালিবাজ শব্দের ঠেকগত ব্যুৎপত্তিগত  অর্থ হল  কোন কিছু রঙ চড়িয়ে বলা বা দেখানো।  আবার কেউ কাউকে ঠকালেও আমরা বলতে পারি জালিবাজ বা জালি লোক ইত্যাদি। আবার আর একটা জালি শব্দের ঠেকগত ব্যবহার হল ভালো না লাগা। সবগুলোর একটা করে উদাহরণ দি। ধরুন আপনার ক এর গান একদম শুনতে ভালো লাগে না। আপনি তখন বলবেন এই ক টা গান গায় একদম জালি লাগে।  এই কথাতে আপনি বুঝিয়ে দিলেন ক এর কোন চর্চা নেই হঠাৎ নাম করেছে, গলা ভালো না ইত্যাদি ইত্যাদি মায় সব আপনার অপছন্দের ওই একটা শব্দ।  আবার ধরুন কেউ একজন রাজনেতা হুলিয়ে (মানে বিপূল) ঘুস খায় আর অত্যাচার অনাচারকে নিত্য সমর্থন করে।  আপনার স্বগোতোক্তি হয়ত এমনভাবে বেরিয়ে আসবে:
শাসন করা তারেই সাজে শোষণ করে যে (সোহাগের তো কোন জায়গায় নেই)।
কিন্তু ঠেকের ভাষার এমন শক্তি এই সমস্ত কিছুকে এক কথায় প্রকাশ করে দেবে।
জালি।
ঝ এ ঝিঙ্কুগো
এবারে  আমরা ঝ এ ঝিঙ্কু নিয়ে আলোচনা করব। এখানে বলে রাখি ঝিঙ্কু এই সময়কার মেয়ে। এখনকার সুখশোকলজ্জাসাহস নিয়েই এই ঝিঙ্কুর চলন বলন। এ ব্যাপারে সেই আমার আগের বলা ঝ এ ঝর্ণাবতী গল্পটা এখানে তুলে দিচ্ছি। তাহলেই ঝিঙ্কু শব্দের কীভাবে প্রচলন হল আমরা তা বুঝতে পেরে যাব। আসলে এই গল্পটা না বলে শুধু উল্লেখ করে দিলেই হোত কিন্তু আমি তো জানি আপনি কী মন দিয়ে আমার গল্প পড়েন আর মনে রাখেন। তাই বাধ্য হয়ে আপনার সন্মান রাখতেই সেই গল্পের আবার এখানে পুন:প্রকাশ।  যাই হোক। গল্পটা বলা যাক।
ঝ য়ে ঝর্ণাবতী
============
ঝ য়ে ঝর্ণাবতী একটা রূপকথার গল্প। ঝর্ণাবতীর জন্ম ঝাড়সুগুদা। রাজা ঝড়েশ্বর আর রাণী ঝিলমের একমাত্র মেয়ে। এক বর্ষার দিনে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছিল। সেই ঝোড় লগ্নেই ঝড়েশ্বর আর ঝিলমের মেয়ের জন্ম। বাবা মা নাম রাখলেন ঝর্ণাবতী। রাজা ঝড়েশ্বর কলেজে ইতিহাস পড়ান। আর রানী ঝিলম স্কুলের ভূগোল। তাদের দক্ষিণ বারান্দা আর দরজায় কলিং বেল লাগান রাজপ্রাসাদ, বুকে কালো ফিতেই বাঁশী লাগান সিড়িজ্ঞে পেয়াদা, একটা লাল রঙের পেট্রোল এর রথ, হেঁসেলের লোক, ভৃত্য মায় সব ই আছে, রাজারাজরাদের যেমন থাকে আর কি! এই রাজবংশে যখন অনেকদিন পর ঝর্ণাবতীর জন্ম হল তখন তার আদরের সীমা থাকল না। আর এই আদরের প্রবাহতেই স্বাভাবিকভাবে রাজকণ্যা বুদ্ধিমতীর সাথে সাথে হয়ে উঠলেন ধীরে ধীরে এক জেদী রাজকন্যা। ঠিক ঝর্ণার মত তার রূপ আবার ঝর্ণার মতোই তার তেজ। কিন্তু ঝর্ণাবতী যত বড় হতে লাগল তার ভেতর একটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করলেন তার বাবা মা। বাবা ঝড়েশ্বর আর মা ঝিলমের জন্যই হোক বা ঝমঝমে ঝড় লগ্নে জন্ম গ্রহণের জন্যই হোক বা ঝাড়সুগুদায় বাস করার জন্যই হোক, ঝর্ণাবতীর ঝ এর প্রতি এক নিবিড় এবং অক্লান্ত ভালোবাসা। কয়েকটা উদাহরণ দিলেই সেটা বোঝা যাবে।
পুজার সময় রাজা ঝড়েশ্বর আর রাণী ঝিলম ঠিক করলেন ঝর্ণাবতীর মামার বাড়ী মিথিলায় আমোদ প্রমোদ করতে যাবেন। কিন্তু বাধ সাধল রাজকণ্যা ঝর্ণাবতী। সে যেতে চায় ঝিখিরা। সেখানে আছে তার পিসিরা। বাবা মায়ের কথা সে কিছুতেই শুনবে না। অদম্য জেদ যে তার। ঝর্ণার জলের মতই উড়িয়ে দেয় সে কিছু পছন্দ না হলে। এরপর আবার, যেখানে ঝ এসে গেছে চিন্তায় আর তো তাকে থামান যাবেনা। এরকম অনেকবার হয়েছে। বাঁকিপুর ক্যান্সেল হয়ে ঝাঁকিপুর যেতে হয়েছে, কাবাব ক্যান্সেল করে ঝিঙের ঝোল খেতে হয়েছে, ঝুলনে ঝুল ঝাড়তে হয়েছে, আবার একবার ঝাল ঝাল ঝামটা ঝেলতে হয়েছে অন্য রাজার অনুচরকে ঝর্ণাবতী ঝুমঝুমি বলে বিদ্রুপ করেছিল বলে।
দেখতে দেখতে ঝর্ণাবতী বড় হয়ে গেল। এরপর যা হয় আর পাঁচটা জেদী রাজকণ্যার মতো তার বাবা রাজা পরিচিত গনিত অধ্যাপকের ছেলে সুশীলের সাথে বিবাহ ঠিক করলেন। কিন্তু এখানেও বাধ সাধল সেই ঝ। ঝরিয়ায় এক ঝর্ণাতলায় ঝুনঝুনওয়ালা নামক এক বনিকপুত্রের সাথে ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে ঝুপ করে দেখা হয়ে গেল আর টুপ করে ঝর্ণাবতীর ভাল লেগে গেল। এরপর একদিন একরকম অশান্তি করে বাড়ীতে ঝামেলার ঝর্ণামালায় মুখরিত করে বনিকপুত্রকে সে বিয়ে করে ফেলল। কিছুকাল পর ঝর্ণাবতীর এক ফুটফুটে কণ্যা হল। এবারও ঝ এর পথ অনুসরণ করে ঝর্ণাবতীর মন তুষ্ট করে নাম রাখা হল ঝিনুক। এরপর ঝিনুক ও বড় হল। ঝর্ণাবতীর রূপ রঙ তো সে পেয়েইছে তার সাথে পেয়েছে আরো বেশী তেজ আরো বেশী প্রখর বুদ্ধি। পাড়ার রাজপুত্ররা এই তেজবুদ্ধিরূপ দেখে ওকে ঝিনুক না বলে ঝিণকু বলে ডাকতে শুরু করল। কিন্তু ঝিনকু মায়ের থেকে যা পেলনা তা হল সেই ঝ। তার ঝ এর প্রতি কোন আগ্রহ নেই। এদিকে ঝিনুকের ঝ গোত্রে বিয়ে দেবার চেষ্টা চলতে লাগল। ঝর্ণাবতী ঝাঁসি থেকে সম্মন্ধ আনে, ঝিন্দ থেকে সম্মন্ধ আনে, ঝাঁঝা থেকে সম্মন্ধ আনে, ঝাঁপানডাঙা থেকে সম্মন্ধ আনে। সমস্ত ঝাঁ চকচকে একাধারে ঝানু অন্যধারে ঝক্কাস পরিবারের থেকে, কিন্তু ঝিনুক রাজী হয়না। এদিকে ঝর্ণাবতীও তার বাবার সাথে যে জেদ করেছিল যৌবনে, নিজের মেয়ের সাথে তা করতে পারছে না। এক ঝর্ণা থেকে উৎসারিত আরেক ঝর্ণা যেমন সমস্ত শক্তি আর সৌন্দর্য নিয়ে এক নতূন রূপ ধারন করে, আগের উৎস ঝর্না হয়ে পড়ে গতিহীন জলধারা, তেমনি দুর্বল হয়ে গিয়ে নিজের মেয়েকে তার জেদ দিয়ে ঝ নামক অলংকার পরাতে পারলেন না। সে যে এখন ঝিঙ্কু হয়ে গেছে।
এটা সাধারণ গল্প হলে এখানেই শেষ করা যেত। কিন্তু এ যে রূপকথা। তাই নিচের অংশ দিয়েই শেষ করা হল।
যে ঝরিয়ায় পঁচিশ বছর আগে ঝ এসেছিল ঝর্ণাবতীর সাথে, সেই ঝ যেন ঝিঙ্কুর সাথে সেই ঝরিয়াতেই ঝরিয়া গেল।
বঁড়শী  দিয়ে মাঝদুপুরে নদীর জলে লুকিয়ে খেলা মাছের জন্যে হন্যে হয়ে তাকিয়ে আছি কখন একটা মাছের দেখা ফাতনা নড়ে। সেই ফাঁকেতেই ঠেকের কথা বলতে বলতে চা শিঙাড়া শব্দবাজি দুনিয়াদারি বাচালপনা। মাছ উঠল? মাছের কথা চায়ের কথা এবং কিছু শব্দকথা আবার আনব পরের বারে।

1 comment:

  1. হা হা হা ...আপনিই পারবেন।

    ReplyDelete