Thursday, 1 December 2016

সোমাদ্রী সাহার গল্প

মিথ্যার পরে
নবগোপাল বাবুর ক’দিন ধরেই কোনও কাজকর্মে তেমন মন নেই। সকালে বাজার যাওয়া ও বাড়ি ফেরার পথে কু মনের মধ্যে ডাকে, হোচট খেয়েছে দু’দিন। নোটের দুর্দিনে কোনও ক্রমে পোনা মাছের ঝোল দিয়ে খেয়েই নবান্নের দিকে দৌড়। অফিসে লেট তো হয়, ঐ মিথ্যা বলেই এখন ম্যানেজ দিতে হয়। তবে কেরানীর চাকরিতে নবগোপালবাবু ঢুকেছিল তেইশ বছর আগে। সেই সময় ছেলে মেয়ে দু’জনেই সবে নার্সারির গন্ডি পেরিয়েছিল। তখন আর এখন বিস্তর পরিবর্তন হয়েছে।
সোনারপুরে আড়াইখানা এক এঁদো গলির ঘরে ভাড়া থাকে স্ত্রী-ছেলেমেয়েকে নিয়ে। তবে জিনের মধ্যে নবগোপালের রয়েছে মিথ্যা আর সাথে রয়েছে পেট খারাপ, বদহজম, জলের সমস্যা, মুদি দোকানে ধার, খুঁটিনাটি নিয়ে পাশের ভাড়াটের সঙ্গে ঝগড়া। তবে এখন স্মার্ট যুগে অনেক মিথ্যাই ধরা যায়। বৌয়ের যে কত মিথ্যা ছেলে-মেয়েকে উড়তে দেওয়ার জন্য তার কিছুই নবগোপালের মাথায় ঢোকে না। আজকাল ছেলেমেয়ের ব্যাপার-স্যাপারগুলো একদম মেনে নিতে পারছেন না। সারাদিন স্কুলে কাটানো ছাড়াও সকাল-সন্ধে প্রাইভেট টিউশন। ফিরে এসেই টিভির সামনে বসা। টিভি মানেই আশি নব্বইটা চ্যানেল। সিনেমা-পানপানানি সিরিয়াল-কার্টুন-খেলা-ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ।  নবগোপাল বুঝে পান না ওরা নিজেরা পড়ছে ও কখন নিজেরা শিখছেই বা কী। টিউশনের নোট নির্ভর জ্ঞান। টুকলি তো রয়েছে চুপকথায়। খালি মিথ্যা অজুহাত দেয় রেজাল্ট খারাপ হলে। দু-একবার নিজে পড়া ধরতে গেলেও ছেলেমেয়েরা বাপমায়ের কাছ থেকে শিখতে নারাজ। মিথ্যার গাছ। বাবা টাকা দেবে আর মা দেবে খেতে, এই গন্ডি পেরলেই মুখ হাড়ি। গায়ে হাত দিলে চুড়ান্ত মিথ্যার নাটুকে অশান্তি।



নবগোপালের ছেলে গোরা। তার পড়াশুনো একদম ভাল্লাগে না। এমন কিছু করতে চায় যাতে সব লোক, সোশ্যাল মিডিয়া তাকিয়ে দেখবে, বাহবা দেবে। আসলে সেলিব্রেটি হওয়াই গোরার লক্ষ্য। স্কুলে বন্ধুদের নিজের সাথে সেলিব্রেটিদের ছবি এডিট করে দেখায়। অনেক ঢপ দেয়। মঞ্চে ঝলমল আলোয় ধোঁয়াশার মধ্যে ব্যান্ডের গান অথবা নায়কের মস্তানকে মেরে অসহায় নায়িকাকে উদ্ধার করে বিদেশের পটভূমিতে নাচ
...
সেদিন গোরার উচ্চ-মাধ্যমিকের ফল প্রকাশের দিন। গোরা বেশ টেনশনের সাথে নেট দেখল। যা হয় জোড় করে বিজ্ঞান নিয়ে পড়েছে, অঙ্কে-ফিজিক্সে ব্যাক। বাড়িতে মাকে ফোন করে মিথ্যা বলে দিল। বলে দিল বন্ধুদের সাথে আছে। পরে ফিরবে। কিন্তু মনে মনে চলতে লাগল ট্রেনে মাথা দেবে, তারপর মেট্রোয় ঝাঁপ, অনেক ঘমের ওষুধ...। কিছুটা সময় পরে থিতু হয়ে ভাবল, না সে তার স্বপ্নপূরণ করবেই। মস্ত বড়ো গায়ক হবে। গানের গলা নাকি গোরার ভালো – পাড়া প্রতিবেশি, মা-বাবা ছাড়াও তার অনুসূয়া তাকে একথা বলেছে। তাই ঝুলন্ত অবস্থায় বাসে চেপে হাওড়ার ষ্টেশনে পৌঁছালো।
একজন ফালাকনামা এক্সপ্রেস দেখিয়ে বলে দিল মুম্বাই যাবে। টিকিট না কেটেই উঠল ট্রেনে। কিন্তু বিশ্বের দীর্ঘতম রেল স্টেশনে ট্রেন থেমে ছিল। টিকিট চেকারের হাতে ধরা পড়তে এক দয়াবান স্যুটবুট পরা ভদ্রলোক তাকে উদ্ধার করল আর ফাইন দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে গেল। তিনি সেদিন বলেছিলেন “কোথায় যাচ্ছো, চলো আমার সাথে।” ট্রেনে আরও কয়েকজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। তারা নাকি ব্যান্ড চালায়। প্রোগ্রামে যাচ্ছে। গোরা তো মুখিয়েই ছিল। তাদের মধ্যে একজন মুম্বাইয়ের বিশিষ্ট সংগীত পরিচালকের সাথে দেখা করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন। কিছুক্ষণ পরেই ওদের দেওয়া একটা চকোলেট খেয়ে সব ঝাপসা... ঠিক টাইমে সে দল ট্রেন থেকে নেমেছে, হুইল চেয়ারে গোরাকে বোর্খা পরে বসিয়েছে। আর কাম তামাম করে পকেট মোটা করে নিয়েছে। কী করেছে!!...
(২)
এরপর সাতদিন কেটেছে – পুলিশ বাক্স বন্দি মৃতদেহ পেয়েছে। নবগোপালবাবু নিজেই সনাক্ত করেছে ওটা গোরার মৃতদেহ। এখানে কোনও মিথ্যে নেই। এখন অঙ্গ প্রতিস্থাপনের চল উঠেছে কিন্তু এখনও যে দুটো কিডনি, চোখের কর্ণিয়া কেটে নেওয়ার ব্যবসা রয়েছে তা শিশু পাচারের অন্ধকার যুগে সকলের কাছেই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। পোস্টমর্টেম অনন্ত তাই বলছে। প্রশাসন ও কেন্দ্র করে এই কালোর কবে চিকিৎসা করবে আন্ধা কানুনও জানে না। মিথ্যার ফলাফলে আজ গোরা বাক্সবন্দি।
...
নবগোপালবাবু এখন জ্যান্ত লাশের মতো চলা ফেরা করে। তাও ভরসা মেয়ে রয়েছে। মেয়ে এখন বোধহয় একটু বাবাকে মানে। অন্তত মিথ্যা বলা কমিয়েছে। মেয়েও বেশ কয়েকটি ছেলেকে মিথ্যা বলে প্রেমের ভান করে অনেক জিনিস হাতিয়েছিল। পাড়ায় মামুনি সেই স্টাম্প লাগিয়ে ফেলেছে। কিছুদিন বেশ চলেছিল প্রেম গন, ব্রেকআপ সং অন। তবুও এই ঘটনায় মেয়ে সুভ্রা কিছুটা বদলেছে। ভালোবাসার মানেটা স্পষ্ট, কিন্তু মনে কিছু চাপা কষ্ট বাড়িতে বলতে পারছে না। আসলে হাত পেতে কিছু নেওয়ার লাইনটা সুভ্রা জানত, মিথ্যার আশ্রয় নিতে জানত ফলাফলটা জানত না।
এক রবিবার সকালে গোরাদের ক্লাসের ফার্স্টবয়ের বাবা প্রভাতাংশু বাবু এসে হাজির। নবগোপাল ভেবেছিল লোকটি বোধহয় কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতে এসেছেন। নবগোপালও মেয়েকে নিয়ে দিব্য আছেন তার মিথ্যা ছলনা করেন। ছেলে যে অকর্মণ্য ছিল তাই ঐ পরিণতি সে সব বলছিলেন কিন্তু প্রভাতাংশু বাবু থামিয়ে বলেন  “আমি ভেবেছিলাম আমার ছেলে ব্রাইট ফিউচার। তাই ওকে ছটা প্রাইভেট টিউটর, সপ্তাহে তিনদিন জিম, একদিন স্পোকেন ইংলিশ ক্লাসে দিয়ে দিই কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্টে লেখা ‘ইনকমপ্লিট’ ব্যাস আমাদের প্রত্যাশার চাপ সহ্য না করতে পেরে শেষে আত্মহত্যা করে ও চিঠির শেষ লাইনে লেখে – বাবা-মা ক্ষমা কর। তোমাদের যোগ্য সন্তান হতে পারলাম না তাই চলে যাচ্ছি।”
নবগোপাল হঠাৎই প্রভাতাংশুর চোখে নিজেকে খুঁজে পেল। সে বুঝল আমি একা অসহায় বাপ না। তার মতো হাজারো হাজারো মিথ্যা প্রত্যাশার মৃত্যু হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
...
আজ নবগোপাল মেয়েকে নিয়ে খোলা ছাঁদে গিয়ে দাঁড়াল। আকাশের দিকে তারাদের দেখল। হিম ঠান্ডা উপেক্ষা করে খোলা বাতাসে শপথ করল – মেয়েকে কোনও চাপ দেবেন না, মিথ্যাও বলতে বলবেন না, মুক্ত হয়ে বাঁচতে দেবে। মেয়েকে বললেন “সুভ্রা আজ কি পূর্ণিমা। চাঁদ কী সুন্দর থালার মতো চেয়ে চেয়ে ভিক্ষা চাইছে – একটু শান্তির... ” মেয়ে কিন্তু তখন মনে মনে ভাবছে সে কী বাবাকে বলবে যে সে প্রেগনেন্ট নাকি অ্যাবর্শনটা করিয়েই নেবে...চোখের সামনে আকাশে ভেসে উঠল গোরার মুখ। কেঁদে ফেলল সুভ্রা। বুঝতে পারল সমাজ তাকে ছোট করেনি, সে ও তার পরিবার ছোট হতে চেয়েছে বড় কিছু পাওয়ার আশায় তাই এই ফলাফল। মিথ্যার পরেই তো সত্যের অবস্থান।
মিথ্যা আসলে একটা চক্রব্যূহ....অর্জুন ছাড়া কেউ কী তার থেকে মুক্তি পথ জানে। বিশেষত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা জনতারা। নাকি পিঁপড়ের সমাজে সবই মোহ, সবই মিথ্যে...সত্য তো আপনার চোখ যিনি এখনও এই লেখার উত্তর খুঁজছেন।

No comments:

Post a Comment