Monday, 5 December 2016

সৌভনিক চক্রবর্তীর কবিতা গুচ্ছ




আমার গ্রাম


আমার বুকের ভেতরে একটা গ্রাম বেঁচে আছে।
শহরের ধুলো বালি এমনকি কংক্রিটের আবর্জনা বাঁচিয়েই।
আমার শরীরের ভেতর বয়ে চলেছে তিরতিরে স্রোতের আত্রেয়ী নদী।
একটা ধুলো মাখা পথ, রঙ্গন ফুলের ছায়া এমনকি একটা একতারার বাউল –
ওরা  প্রতিদিন আসে আমার হৃদির হাটে।
রাত বাড়তে বাড়তে স্পর্শ করে তারাদের –
আখড়ায় আমার মন বাউল –
“ওরে মন হবেই হবে”
আমার ছনের চাল বেয়ে নেমে আসে কনক ধানের জ্যোৎস্না।
আমি মাটির দাওয়ায় বসেই স্বপ্ন দেখি।
জামগাছের আড়ালে আমার গ্রামটা লুকোচুরি খেলে।

আমার বুকের মাঝে যে গ্রামটা আছে ?
তার মাঝ বরাবর নদীর পার ঘেঁষে আমি হেঁটে যাই।
থকথকে সকালের সূর্যে – আমার গ্রামটাই পাল্টে যায়।
আমি রূপকথার মত বুনেদি নাম না জানা এক একটা বীচ।
আমি দুচোখ দিয়ে দেখি আমার ছেলেবেলা –
হাতে, কাঁটা ঘুড়ি নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে আলপথ ধরে।

আমার বুকের মাঝে যে গ্রামটা আছে –
তার বটবৃক্ষের ছায়ায় ঘুমিয়ে থাকে একটা অন্ধ কুকুর।
আড়াইডাঙার মাঠ থেকে গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে উঠানের কোণায় এসে দাঁড়ায়।
ন’কাকিমা কলাপাতায় তুলে রাখে এঠোকাঁটা এবং উচ্ছিষ্ট ভাত।
ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা ধুলো বালি –
বারিন কাকার কুনকী মাপা বিন্নি ধানের খই
সোনা পিসিমার উঠান জুড়ে ডালের বড়ি...
আর আমি, বাবার চোখ দিয়ে দেখি –
আমার সন্তান -
“স্বগৃহে পুজিত মূর্খা, স্বগ্রামে পুজিত প্রভু
স্বদেশে পুজিত রাজা, বিদ্বান সর্বত্রই পুজিত”

আসতে আসতে ঘুম নেমে আসে চোখে
ঘুমের চাদর গায়ে - শহর বাঁচিয়ে
আমার গ্রাম বিস্তার করতে থাকে আমার বুকের অলিন্দে।



বেশ্যা


আস্তে আস্তে কক্ষ পাল্টাছে পৃথিবী।
চেনা পথ ছেড়ে ফিরে আসছে সাতফুট বাই সাতফুটের ভেজা ঘরে ।
উন্মত্ততার আস্তিনে লুকানো হাহাকার
বারি খেয়ে ফিরে যায় পলেস্তারা খসা দেওয়ালে।
আসলে মনের প্রতিটা স্তরও খসে পড়ছে 
শরীর থেকে বেরিয়ে আসছে আঁশটে গন্ধ ...
সম্পর্ক গুলো বড় শিথিল

নিওন আলোর নীচে পণ্য ! নিওন আলোর নিচে পর্ণ
একই শব্দের ভিন্নার্থক ।

প্রাগ ঐতিহাসিক সভ্যতা থমকে দাঁড়িয়েছে ।
এখানের পৃথিবী আলাদা !




বিপদসীমা


বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে প্রেম
থারমফ্লাক্সের উষ্ণতায় ঘনীভূত দুটি সত্ত্বা;
একে মৃত্যু দুয়ে ভালোবাসা !
নির্ধারণ করাটা কতটা সমুচিত
সে আলোচনা বা পর্যালোচনা বরং তোলা থাক
আলমারির সিফন শাড়ীর ভাঁজে ।
মুখোমুখি দুটো ঠোঁটের মাইল মিটারে
যতিচিহ্ন ! অবান্তর প্রশ্ন কেন হে ?
এখানে কি কেউ মানুষ নেই ?
রেজাউল – তাহের – বন্যারা
ঘুমিয়ে রয়েছে স্রোতস্বিনী কবিতায় !
নুরি পাথর কুড়িয়ে নেওয়া যাক
আসন্ন মৃত্যুর লিপ্সায় !
তবুও প্রেম, বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে
একে ভালোবাসা দুয়ে মৃত্যু !
সাইনবোর্ড মুছে দেওয়া হল ।।



উপহার


তোমার দেওয়া উপহারের দিকে চোখ ফেরাতেই
ভেসে আসল আতরের মন মাতানো গন্ধ
     ছায়াপথ ধরে দু’পা এগোতেই রঙমশাল...
চাঁদের জ্যোৎস্নায় বিছানা পাততেই
এক ঝাঁক সবুজ জোনাকি - স্বপ্নের তারামহলে...
     ঘন কুয়াশার চাদর জড়িয়ে নিলো বুকের উত্তাপ।

ঘাসের সংসারে - সবুজ সুখী গৃহকোণ
আর মাত্র দু’পা এগোলেই ফলসা গাছের আডালে একটা গোটা জলপ্রপাত
তুমি বললে –
          আজ জন্মদিন
     চলো, পা ডুবিয়ে স্বর্ণকমল ফোঁটা দেখি !




বিসর্জন


জলে ঝাঁপিয়ে পড়তেই ভেসে উঠল –
হলুদ পারের লাল শাড়ীর টুকরো
ব্লাউজের ছেঁড়া হাতা -  হাতের কঙ্কণ – নাকের নথ
হাড় – পাঁজর এবং নিতম্বের কিছু অংশ।

আরও কিছুটা গভীরে যেতেই - বুদবুদ করে ভেসে উঠলো
রক্তের মত গাঢ় লাল রং।
একটা ডুব দিতেই নাকে ভেসে আসলো
শরীর চেনা পচা ফুল বেলপাতার গন্ধ।

একটা মাটির শরীর মাটিতে মিশের যাওয়ার আগে
যেভাবে ঘটা করে বিসর্জন হয়, অথবা
রাতের অন্ধকার, দিনের আলোর মত উজ্জল হয়ে থাকে
গ্যাস লাইটের আলোয়।

সেভাবেই বিসর্জন হয় ।
প্রতিদিন বিসর্জন হয় নাম না জানা কত...
পবিত্র গঙ্গা ছিঁড়ে খায় এক একটা শরীর।



বড় দেরি করে এলে


বহুদিনের ওপারে দাঁড়িয়ে দেখা হল
তবে যে কথা হওয়ার ছিল –
তাও ফুরিয়েছে ওপারে দাঁড়িয়েই।
গন্তব্যের  অভিমুখে এসে পথ ছেড়ে দিলেছিল –
                        তুমি না আমি !
কালো ফ্রেম, কাঁচাপাকা দাড়ি
              অনেকটা সময় খরচ হয়ে গেছে
     বাক্সের ভেতর যৌথ স্বপ্নের
              ফুলফুল সোয়েটার
                   কুরুশকাঁটা,
                   আর চোদ্দটা বছর।
সেই তো এলে, বড় দেরি করে এলে। 




চারকোন আর ছোটো ছোটো নুড়ি কথা


প্রেম ভাঙার মরসুমে
কিছু বস্তাপচা অনুভূতি ছুঁয়ে গেল।
টার্বাইনের চাকায় ভেসে গেল চোরাস্রোত
সে কথা কালজানিও গোপন করেনি।

মিশরীয় সভ্যতার পুনঃখননে উঠে এলো
প্রাগঐতিহাসিক প্রেম প্রত্নতত্ত্ব
বালি ভাস্কর্যের আঙুল ফস্কে হঠাৎ জীবন্ত
ইতিহাস খোচিত কিংবদন্তী ।

ছোটো ছোটো নুড়ি পাথরে আত্মগোপন করা
নান্দনিক অনুভূতির পিঠে পুরু শেওলা
মৎস্যগন্ধার কুমারিত্বে প্রশ্নচিহ্ন বরং থাক
ইতিহাসে ফিরে আসা যাক।

ফ্রয়েডিও প্রেমের নিষিদ্ধ শুদ্ধাচারন কেন ?
রবি বাউলে ফিরে দেখা যাক প্রেম পর্যায়
মাদ্রির সহমরণের আগুনে বরং ফিরে আসুক
প্রেম ভাঙার মরসুম।।

সীতার অগ্নিপরীক্ষা সর্বজনবিদিত
ওটা স্বাভাবিক বা সামাজিক , মেনে নিতে হয়
এবার দুলকি চালে কেপে উঠতে পারে পায়ের তলার মাটি
কারণ,আমি রামের পৌরষত্বে প্রশ্ন তুলছি।।



কাঙালপনা


এখন যদি এমন এক বৃষ্টি হত
ঘর জানালা দুয়ারটাকে ভিজিয়ে দিয়ে
অন্যরকম মেঘলা আকাশ
তোমার জন্য প্রেম জমিয়ে

বৃষ্টি হত আমায় নিয়েই ওতপ্রোত
রাত জাগা সেই গানের খাতায়
তিস্তা তখন অন্যরকম নাচের তালে,
অন্যরকম খরস্রোতে বৃষ্টি হত।

যদি এমন একটা মেঘলা আকাশ
আমায় দিতে; হঠাৎ করে ভীষণ রাগে -
তোমায় আমি সত্যিকারের
ভিজিয়ে দিতাম সবার আগে।

বৃষ্টি তোমার ছুঁইয়ে যেত
কপাল থেকে  স্বপ্ন মূলে
বৃষ্টি তখন তোমার ঠোঁটের ,
দুই বিনুনি মাথার চুলে

বৃষ্টি যদি সত্যি তখন এমন হত;
ভীষণ দামী সত্যি যেন হিরের কণা
প্রেমের মত বৃষ্টি নিয়ে তোমার জন্য
দেখতে আমার হঠাৎ কেমন কাঙালপনা।

No comments:

Post a Comment