লিপস্টিক ও ডিওডোরান্ট
ফ্লাস্ক
থেকে দু’কাপ চা বার করে ফ্লাস্কটা বন্ধ করতে করতে আমাকে উদ্দেশ্য করে অর্ক বলল-
“আচ্ছা বল তো ডিওডোরান্ট বলে কারোর নাম হতে পারে?” আমি তো শুনে থ! বললাম, ডিও, মানে ডিওস্প্রে ? কি সব যা’তা বলছিস ? এখন
মজা করার সময় তোর ?” আমার কথা শুনে হাসতে হাসতে এক কাপ চা
আমার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে ও বলল “তোর মৈনাক নামটা যদি
আমার আর জ্যেঠুর কাছে মানিকচাঁদ হতে পারে, তবে সেটাও কেন
হবে না? এই নে চা খেতে খেতে ঘটনাটা মন দিয়ে শোন, জানি গত দুদিন ধরে অপেক্ষা করছিস!” আমি এতক্ষণ
যেন এই কথাটা শোনার অপেক্ষাতেই ছিলাম। দেওয়াল ঘড়িতে রাত্রি ন’টা বাজতে পাঁচ। আজকেও প্রায় একঘণ্টা ধরে আমাদের এ অ্যান্ড এম
কন্সালটেন্সীর অফিস ঘরে অপেক্ষা করে বসে আছি ও’র জন্য,
অথচ বাবুর কোন পাত্তা নেই। আজ বুধবার, গত
দুদিন ধরে প্রত্যেকদিন আমি অফিস থেকে ফিরে আমাদের চেম্বারে এসে আমি একা একাই
ধূপধুনো দিয়ে ফিরে গেছি, বাবুর কাজের চাপে এখানে আর আসা
হয় নি। আমারই দেওয়া একটা কেসের তদন্তে বাবু এখন ভীষণ ব্যস্ত, তাই আমার সাথেও কথা বলা বা দেখা করার সময় নেই।
এই প্রথমবার আমি সরাসরি ওর সাথে কোন তদন্তে থাকতে পারি নি, অফিসের কাজের চাপের জন্য আর তাই কথাটা শোনার সাথে সাথে একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বলে উঠলাম “দেখ ভাই, এখন আর মজা করিস না, আমার মনে হচ্ছে কেসটা খুব সিরিয়াস, তবু বলছি প্রিয়দর্শনকে আমার চাই, তুই তো জানিস কিরকম চাপের একটা প্রজেক্ট চলছে অফিসে আর আমি সেই প্রজেক্টের টিমলিডার। প্রিয় আমার টিমের একজন একটিভ মেম্বার। খুব ভালো ছেলে, আমার মনে হয় না ও বা ওর পরিবারের কেউ এই ঘটনার সাথে যুক্ত। ও না থাকলে প্রজেক্টটা পুরো ঝুলে যাবে রে ভাই! আমাকে বাঁচা”, আমার গলায় হতাশার সুর ঝরে পড়ল।
এই প্রথমবার আমি সরাসরি ওর সাথে কোন তদন্তে থাকতে পারি নি, অফিসের কাজের চাপের জন্য আর তাই কথাটা শোনার সাথে সাথে একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বলে উঠলাম “দেখ ভাই, এখন আর মজা করিস না, আমার মনে হচ্ছে কেসটা খুব সিরিয়াস, তবু বলছি প্রিয়দর্শনকে আমার চাই, তুই তো জানিস কিরকম চাপের একটা প্রজেক্ট চলছে অফিসে আর আমি সেই প্রজেক্টের টিমলিডার। প্রিয় আমার টিমের একজন একটিভ মেম্বার। খুব ভালো ছেলে, আমার মনে হয় না ও বা ওর পরিবারের কেউ এই ঘটনার সাথে যুক্ত। ও না থাকলে প্রজেক্টটা পুরো ঝুলে যাবে রে ভাই! আমাকে বাঁচা”, আমার গলায় হতাশার সুর ঝরে পড়ল।
অর্ক, একটা
সিগারেটটা ধরিয়ে, তাতে একটা টান দিয়ে, নিজের ল্যাপটপটা অন করতে করতে আমাকে বলে উঠল – “দেখছি, কি করা যায়। আমি থাকতে কোন নিরপরাধ
ব্যক্তির শাস্তি হবে না, সে তো তুই জানিস! আগে ঘটনাটা আমরা প্রথম থেকে একটু গুছিয়ে নিই, তারপরে
শুরু করছি আমার কথা। সোমবার সাতসকালে অফিসে পৌঁছে তুই অন্যান্য দিনের মত কাজ
করছিলিস। হঠাত করে তোর মোবাইলে প্রিয়দর্শনের ফোন আসে। ঘটনাচক্রে তুই জানতে পারিস
ওদের বাড়িতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার কথাটা। ও’র বউদি মিসেস
সুলগ্না গাঙ্গুলীর মৃত্যু হয়েছে আজ সকালে ওদের ব্যারাকপুরের বাড়িতে। আগের দিন,
অর্থাৎ রবিবার রাত্রে প্রিয়র বাবা অপূর্ববাবু ও মা পারমিতাদেবীর
ত্রিশতম বিবাহবার্ষিকীর অনুষ্ঠান ছিল। গভীররাত্রি অবধি হইচই হওয়ার পরে খেয়ে দেয়ে
সকলেই শুয়ে পড়ে। তাই সোমবার সকালে সকলেরই দেরী হয়েছে ঘুম থেকে উঠতে। সকাল বেলায়
সর্বপ্রথমে ওনার শাশুড়ি, ওনাকে ঘরে মৃত অবস্থায় দেখতে
পান। মাত্র তিনমাস হয়েছে, প্রিয়র দাদা সুদর্শনবাবুর সাথে
ওনার বিয়ে হয়েছে, তাও দেখাশুনো করে। প্রথমে সকলে সুইসাইড
মনে করলেও পরে, সুলগ্নাদেবীর বাপের বাড়ির অভিযোগের
ভিত্তিতে পুলিশ সুদর্শনবাবুকে ধরে নিয়ে যায়, আর তাই প্রিয়
তোকে ফোন করে অনুরোধ করে এ ব্যাপারে তাদেরকে আমরা যেন সাহায্য করি। ওদের পরিবারের
বক্তব্য, সুলগ্নাদেবীর নিশ্চয়ই কোন পুরোনো প্রেমিক আছে,
আর এই বিয়ে ওনার ইচ্ছের বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে। আর তাই উনি নিজেই
আত্মহত্যা করেছেন। আর তারপর তোর ফোন পেয়ে সোমবার সকালেই আমার ব্যারাকপুর গমন”।
আমি
সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “তারপর, এই দুদিনে ওখানে কি হল বিস্তারিত বল... কতক্ষণ
ধরে ওয়েট করছি তোর জন্য”।
অর্ক
সিগারেটের কাউন্টারটা আমাকে দিয়ে বলল, “হুম! আমি প্রথমে ভদ্রদাকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করে নিয়েছিলাম ব্যারাকপুরের
পুলিশ লাইনে কার সাথে কথা বললে কাজ করতে সুবিধে হবে। উনি খোঁজ নিয়ে জানালেন যে
ওখানকার পুলিশ সুপার মিঃ অমিয় মুখার্জী আছেন, ভদ্রদার
পূর্বপরিচিত। ওনার সাথে কথা বললেই সুবিধা হবে। আমি ভদ্রদার কাছ থেকে ফোন নম্বর
নিয়ে ওনার সাথে কথা বললাম । ফোনে পরিচয় দিতেই, ভদ্রলোক
আমার নাম চিনতে পারলেন। আমি ওনাকে বললাম যে ব্যাপারটার তদন্ত করতে আমি যাব
সেদিনকেই। উনি যদি থাকেন তো খুব ভালো হয়। তারপর বাবাকে বলে গাড়ি নিয়ে সোজা
ব্যারাকপুর।
এত
অবধি বলে হঠাৎ ল্যাপটপে কিছু একটা দেখতে শুরু করে আবার চুপ মেরে গেল। কিছু একটা
খুব মন দিয়ে দেখছে বুঝলাম। আমি আমি ওকে দেখছিলাম আর আমার আগের কথা মনে পড়ছিল। কত
তাড়াতাড়ি অর্ক পরপর চার-পাঁচটা হাই প্রোফাইল কেস সল্ভ করে এখন এই শহরের গোয়েন্দা ও পুলিশ মহলে
যথেষ্ট পরিচিত নাম। আর হ্যাঁ, ওর সাথে আমিও, কারণ শুধু এই কেসটা ছাড়া আর বাকি সবগুলোতেই ওর ছায়াসঙ্গী হয়ে ঘুরে
বেড়িয়েছি আমি, আর তাইতো প্রিয় আমাকেই প্রথমে ফোন করে
রিকোয়েস্টটা করেছিল।
কিছুক্ষণ
পর আবার অর্কর গলা পেয়ে সম্বিৎ ফিরল, ও ততক্ষণে বলতে শুরু করেছে
“সুলগ্নাদেবীর মৃত্যুর কারণ ওনার পেটে থাকা বিষ, আর এই বিষটাই একটা ধোঁয়াশা সৃষ্টি করেছে জানিস তো? ময়নাতদন্তের ডাক্তারবাবু ও পুলিশসুপার মুখার্জীবাবুর সাথে আলোচনা করে
বোঝা গেল এধরণের বিষ প্রয়োগে মৃত্যু এখনো আমাদের দেশে প্রায় বিরল ঘটনা। তাই
সুইসাইড মনে করাটা মুশকিল!” আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “কেন রে সাঙ্ঘাতিক কিছু নাকি?” জবাবে অর্ক
আমাকে ফের একটা প্রশ্ন করে বসল, “অ্যান্টিফ্রীজ কি বস্তু
জানিস ?” আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকাতে অর্ক বলল, “বুঝেছি ! আর বলতে হবে না, সুলগ্নাদেবীর পেটে যে বিষ পাওয়া গেছে, তা কোন
খাদ্য বা পানীয়র মাধ্যমে ওনার পেটে যায় নি, গেছে ওনার
লিপস্টিকের মাধ্যমে। কেউ ওনার লিপস্টিকে সেই বিষ মিশিয়ে দেয়। আমি লিপস্টিক পরীক্ষা
করে দেখলাম, ওটা একটা নতুন লিপস্টিক, মনে হল, সুলগ্নাদেবী সবে প্যাক খুলে ব্যবহার
করেছেন। ওখানে পৌঁছে তদন্ত করে যা বুঝলাম তা বলি আগে - প্রিয়দর্শনদের
পরিবারের এলাকায় বেশ সুনাম, ওর বাবা মিঃ অপূর্ব গাঙ্গুলীর
সমাজসেবা মূলক কাজের সুবাদে। পাড়া প্রতিবেশীদেরও বক্তব্য খুব পরিষ্কার যে গাঙ্গুলী
পরিবারের সকলেই খুব ভালো এলাকায়। আশেপাশের লোকেও বিশ্বাস করতে পারছেন না, যে সুদর্শনবাবু বা ওর পরিবারের কেউ এর সাথে জড়িত। সুদর্শনবাবু বর্তমানে
একটি বেসরকারী ব্যাঙ্কে কর্মরত। ওনার বাবা অপুর্ব গাঙ্গুলী একজন রিটায়ার্ড সরকারী
ব্যাঙ্ককর্মী। মা, পারমিতাদেবী হাউসয়াইফ। সব মিলিয়ে
ছিমছাম, শান্তিপ্রিয়, মধ্যবিত্ত
ফ্যামিলি।
প্রথমে
মিঃ মুখার্জীর সাথে কথা বলে ওনার দেওয়া এক অনুচরকে সাথে নিয়ে তাই সোমবারই
প্রিয়দর্শনদের বাড়িতে গেলাম। সকলকে আলাদা করে জেরা করে যা বুঝলাম, মোটামুটি
সকলের বক্তব্যই এক, কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। রবিবার
সন্ধ্যায় হওয়া অনুষ্ঠানে দুই পরিবারের সকলে মিলিত হয়েছিল, দু’চার জন বন্ধুবান্ধবও ছিল সেই পার্টিতে।
সবকিছু ঠিকঠাক মিটে যাওয়ার পরে সকলে রাতে দেরী করে খাওয়াদাওয়ার পরে প্রায় রাত একটা
নাগাদ শুতে চলে যান। সকালে সকলেরই একটু দেরী হয় উঠতে । পরে যখন থানায় গিয়ে আটক
সুদর্শনবাবুর সাথে কথা বললাম, তখন উনি জানালেন যে
সুলগ্নাদেবী ওনার শরীরখারাপের কথা শোয়ার আগে থেকেই বলছিলেন। তাই ঊনি ওনাকে একটা
ডাইজিন খেয়ে শুয়ে পড়তে বলেন। ভোরের দিকে পেটেব্যাথাও হয়ে দুবার বমিও করেছিলেন উনি।
সুদর্শনবাবু ভেবেছিলেন সকালে ডাক্তার দেখিয়ে নেবেন। কিন্তু সে সুযোগ আর সুলগ্না
দেবী কাউকে দেননি। পরের দিকে সুদর্শন বাবু ঘুমিয়ে পড়েন । সকাল বেলা সুদর্শনবাবু
যখন নিজে উঠে বাথরুমে যান, সুলগ্নাদেবী অন্যদিকে কাত হয়ে
শুয়েছিলেন বলে ওনার মনে তখনও কোন সন্দেহ হয় নি, ভেবেছিলেন ঘুমিয়ে আছেন ওনার স্ত্রী। ঠিক তখন বৌমাকে ডাকতে এসে
পারমিতা দেবী আবিষ্কার করেন যে সুলগ্নাদেবী মৃত। সাথে সাথে চিৎকার করে সারা বাড়ি মাথায় করে সকলকে ডাকেন। সুলগ্নাদেবীর
বাড়ির লোককেও খাবর দেওয়া হয়, পারিবারিক ডাক্তারকেও ডাকা
হয়। ডাক্তারবাবু এসে ওনাকে মৃত ঘোষণা করেন। বাড়ির লোকেদেরও আলাদা করে জিজ্ঞগাসা
করে মোটামুটিভাবে একরকমই স্টেটমেন্ট পেলাম। তারপর ওখানে আসা পারিবারিক বন্ধুদের
নামঠিকানা আর ফোননম্বর নিয়ে আমি ওনাদের বাড়ি থেকে উঠে পড়লাম। আসার আগে আমি সারা
বাড়ি, সুলগ্নাদেবীর ঘর, জিনিশপত্র
তন্ন তন্ন করে খুঁজে নিয়েছি, আর সবার অলক্ষ্যে
সুলগ্নাদেবীর পার্স থেকে ওনার মোবাইলটা সুকৌশলে আমি আমার জিম্মায় নিয়ে নিয়েছিলাম।
সুদর্শন
বাবুর বক্তব্যও ফেলার মত নয়। উনি আমাকে পরিষ্কার বললেন, যে
এই বিয়ে করে উনি হতাশ হয়েছেন, কারণ বাবা-মায়ের ইচ্ছেতে বিয়ে করে উনি ধোঁকা খেয়েছেন। এই তিনমাসে ওনার আর
সুলগ্নাদেবীর স্বামী-স্ত্রী হিসাবে কোনরকম সম্পর্ক গড়ে
ওঠেনি । প্রথমদিকে উনি খুব একটা আমল দেন নি, কারণ
ভেবেছিলেন হয়ত সুলগ্নাদেবীর স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। কিন্তু পরেরদিকে এতটাই হতাশ
হয়ে পড়েন যে, স্ত্রীকে ডাক্তার দেখাবারও কথা বলেন। কিন্তু
সুলগ্নাদেবী ভয় পেতেন, কিছুতেই ডাক্তাররের কাছে যেতে চান
নি। এই নিয়ে এরই মধ্যে ওনাদের মধ্যে বেশ কয়েকবার মনোমালিন্যও হয়ে গেছে। একদিন তো
ঘটনা এতদূর এগোয় যে, সুদর্শনবাবুর চিৎকারে পুরো বাড়ির লোক
একজায়গায় জড়ো হয়ে যায়। সুলগ্নাদেবী এতটাই চাপা স্বভাবের মহিলা ছিলেন যে, কিছুতেই উনি কিছু বলেননি। আর তাই, সুদর্শনবাবু
নিজের মত খোঁজ নিয়ে জেনেছিলেন যে ওনার বিয়ের আগে কোন সম্পর্ক ছিল, যেটা সুলগ্নাদেবীর বাপের বাড়ি থেকে বিয়ের সময়ে চেপে যাওয়া হয়। একই কথা
পারমিতা দেবীও বলেছেন যেটা আমায় ভাবাচ্ছে রে! এক্ষেত্রে
রাগ বা হতাশার মাধ্যমে স্ত্রীকে বা বৌমাকে খুন করে দেওয়াটা কোন বড় কথা নয় আর সে
সন্দেহটা আমার আরো জোরদার হল, ওনার বন্ধুর সাথে কথা বলে।
তারপর
সুলগ্নাদেবীর বাপের বাড়ি গিয়েও কথা বললাম, ওনারা যদিও আমার কাছে
স্বীকার করলেন যে, সুদর্শনবাবু বা ওনার পরিবারের উপরে পণ
বা শারীরিক অত্যাচারের ব্যাপারে ওনাদের তেমন কোন অভিযোগ ছিল না। মাত্র তিনমাস
হয়েছে বিয়ে হলেও সুলগ্নাদেবীকে মোটের উপর সুখীই মনে হয়েছিল ওনাদের। মেয়েও কোনদিন
কোন কমপ্লেন করেন নি ওনাদের কাছে। আগের দিন ওনারাও উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানে।
কিন্তু মেয়ের অকস্মাৎ সন্দেহজনক মৃত্যুর জন্য ওনারা পুলিশে অভিযোগ করেছেন। ওনারা
অবশ্য বললেন, সুলগ্নাদেবীর আগেকার কোন বয়ফ্রেন্ড বা লাভ
আফেয়ার্স বলেও কিছু ছিল না। আসলে উনি খুব ইন্ট্রোভার্ট প্রকৃতির মহিলা ছিলেন। সারা
স্কুল ও কলেজলাইফ ধরে ওনার সবচেয়ে বিশস্ত বন্ধু বলতে একজনই ছিলেন, মিস দিওতিমা বোস, দুজনেই দুজনের খুব কাছের
বন্ধু ছিলেন। সারা দিন ধরে ঘরের মধ্যে বসে নিজেরাই গল্পগুজব করতেন। প্রিয়দের বাড়ি
থেকে ওঠা অভিযোগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলেই জানালেন ওনারা। তবে এর বেশী কিছু আর না
জানা যাওয়াতে, ওখান থেকে বেরিয়ে প্রথমে সুদর্শনবাবু ও পরে
বাকি নিমন্ত্রিত চারজন বাইরের লোকেদের সাথেও সেদিনকেই কথা বললাম। সকলেই ওদের
ব্যারাকপুরেরই বাসিন্দা।
প্রথমজনের
নাম সুব্রত মজুমদার,
বয়স প্রায় পঁয়ত্রিশ, অপূর্ববাবুর
ছেলেবেলার বন্ধু। গাঙ্গুলীপরিবারের সাথে বহুদিনের আলাপ, প্রায়
সব অনুষ্ঠানেই হাজির থাকেন, কিন্তু সুলগ্নাদেবীকে আগে
থেকে চিনতেন না, বিয়ের পরেই পরিচয়। কাজ করেন এক মোটরগাড়ির
শোরুমে। সেদিন সুলগ্নাদেবীর আচরণে কোনরকম অসঙ্গতি দেখেছিলেন কিনা জিজ্ঞাসা করাতে
উনি বললেন তিনি সেরকম কিছু বুঝতে পারেন নি। দেখে খুব ভদ্র ও নিপাট ভালো মানুষ বলেই
মনে হল।
দ্বিতীয়জন
মিস দিওতিমা বোস,
ফোন করে আমিই ওনার বাড়িতে গিয়ে কথা বলে এলাম। ওনার পরণে ছিল
জিন্স ও টি শার্ট। ববকাট চুল । বয়স আনুমানিক পঁচিশ থেকে ত্রিশের মধ্যে। চোখ-মুখ দেখে কয়েকদিন না ঘুমানোর কষ্টটা টের পাওয়া গেল। বন্ধুর অকস্মাৎ
মৃত্যু ওনাকে মানসিকভাবেও ভেঙ্গে দিয়েছে বলেই মালুম হল। শারীরিক গঠন ও কথাবার্তায়
একটু ছেলে ছেলে ভাব। সুলগ্নাদেবীর সাথে হাইস্কুল থেকে বন্ধুত্ত্ব। প্রশ্নের জবাবে
উনি শুধু বললেন, হ্যাঁ আমি সুলগ্নাকে খুব কাছ থেকে চিনি,
ওর স্পেশাল অনুরোধেই এই প্রথমবার আমার ওদের বাড়ি যাওয়া, আসলে সুলগ্নার বিয়েতে আমি উপস্থিত থাকতে পারি নি তো তাই। কারণ জিজ্ঞাসা
করাতে বললেন, সুলগ্নার বিয়ের সময়ে উনি এখানে ছিলেন না।
কাজের কথা জিজ্ঞাসা করাতে বললেন, ওনাদের গাড়ির ওয়ার্কশপ
বিজনেস আছে। উনি ওনার বাবার সাথে সেটাই দেখাশোনা করেন। কথাবার্তা খুব কাটকাট ।
সুলগ্নাদেবীর বিয়ের আগে কোন ছেলেবন্ধু ছিল কিনা জিজ্ঞেস করাতে, প্রথমে না বললেন, তারপরে নিজেকে দেখিয়ে বললেন,
এই শর্মার জন্য কেউ ধারেকাছে ঘেঁষতে পারে নি সুলগ্নার, নাহলে ছুকছুক তো অনেক ছেলেই করেছিল, সুলগ্নাকে
দেখতে ভীষণ ভালো ছিল জানেন তো? আমার জন্যই কেউ ভয়ে ওকে
প্রপোজ করতে পারে নি। একবার একটা ছেলে লুকিয়ে চিঠি দিয়ে গিয়েছিল, ওকে এমন মেরেছিলাম যে ছেলেটার হাত ভেঙ্গে গিয়েছিল। এই ঘটনার পিছনে অন্য
কাউকে ওনার সন্দেহ হয় কিনা জিজ্ঞাসা করাতে মিস দিওতিমা বললেন, দেখুন আমি খুব সোজা সাপ্টা মানুষ, আমারও মনে
হয় খুনটা গাঙ্গুলী পরিবারেরই কেউ করেছে। আমি বলেছিলাম সুলগ্নাকে বিয়ে করিস না,
আজকালকার ছেলেদের ভরসা নেই, পণ নিয়ে
মাথা খারাপ করে দেবে, তখন শুনল না কিছুতেই। ঐ সুদর্শন আর
ওর মা ওরা দুজনেই ঐ লিপস্টিক দিয়েই খুনটা করিয়েছে। ওনাকে দেখে মনে হল, প্রিয় বান্ধবীর অকাল মৃত্যুতে খুব আঘাত পেয়েছেন। ওনার ঘরের দেওয়ালে
দিওতিমা দেবী ও সুলগ্নাদেবীর একসাথে তোলা অনেকগুলো ছবি দেখলাম। ওনার বাড়ির লোকেদের
কথায় যবে থেকে বন্ধুর মৃত্যু হয়েছে, তবে থেকে বাড়ি থেকে
বেরোতে পারেন নি কষ্টে।
তৃতীয়
জন ও চতুর্থজন দুজনেই যমজ ভাই। নাম পরিমল ও বিমল। নিজেদের ব্যবসা আছে। দুই ভাই সুদর্শনবাবুর
বন্ধু। প্রথমজনের মত সব অনুষ্ঠানে ওনারা আসতে পারেন না ব্যাবসা ছেড়ে। এবারেই আসার সময়
পেয়েছেন। বয়স দুজনেরই এক ত্রিশের ঘরে। দেখে আপাতঃদৃষ্টিতে সন্দেহজনক মনে হল না দু ভাইকেই।
সেদিনকে কোনকিছু অস্বাভাবিক দেখেছেন কিনা জিজ্ঞেস করাতে বিমলবাবু
বললেন, একটা ঘটনার কথা, সেদিন
যখন বন্ধুরা মিলে ড্রিঙ্কস করবেন বলে ঠিক করলেন, তখন একটা
গ্লাস কম পড়াতে তিনি ঘরের মধ্যে যান গ্লাস আনতে, তখন তিনি,
সুলগ্নাদেবীর ঘরের ভিতর থেকে ওনার গলার আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলেন,
শুনে ওনার মনে হয়েছিল, কেউ ওনাকে কিছু
গিফট দিয়েছে আর উনি মজা করে বলছিলেন আরে কি ভালো ভাগ্য আমার, আজকে আমার শ্বশুর-শাশুরীর বিবাহ-বার্ষিকী, আর কি’না
গিফট আমি পেলাম ! আমি আজকেই এক্ষুণি পরব। থ্যাংক ইউ সো
মাচ... ডিওডোরান্ট।
কথাটা
শুনে আমি হেসে বললাম,
“ডিওডোরান্ট বলে আবার কারোর নাম হতে পারে ?” অর্ক হেসে বলল, “আমিও সেটাই ভাবছিলাম রে!
তাই তো তোকে জিজ্ঞাসা করলাম! আর তুই
ভাবলি আমি মজা করলাম তোর সাথে। সবকিছু আমি নোট করে নিয়ে সকলকে বিদায় দিয়ে সোমবার
গভীর রাত্রে ফিরলাম। গতকাল আবার আমাকে ওখানে যেতে হয়েছিল। অনেক কিছু অনেক রকম ভাবে
বিভিন্ন আঙ্গেল থেকে দেখে তবে আবার গতকাল রাত্রে ফিরেছি”।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কিছু বুঝতে পারলি? অর্ক, হেসে আমাকে বলল, নিশ্চয়ই, কিছুটা তো বুঝেছি,
আর তাই আগামীকাল সকলকে আবার মিঃ মুখার্জীর কোয়ার্টারে আসতে বলে দিয়েছি সকালবেলায়।
ওখানেই বাকি সব কাজ হয়ে যাবে বলেই মনে হচ্ছে। আর তুইও কাল আমার সাথে অফিস কামাই করে ওখানে যাবি”। আমি সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে রাজী হয়ে গেলাম আর ভয়ে ভয়ে আবার জিজ্ঞাসা
করলাম, “তুই কি বুঝতে পেরেছিস কে করেছে ?”
অর্ক হেসে বলল, হুম! কিন্তু ডাইরেক্ট প্রমাণ নেই সেরকম এখনও অবধি, যদি না সে নিজে
মুখে স্বীকার করে। সব ওই
সারকামস্ট্যানসিয়াল এভিডেন্স বুঝলি ? তবে তাও আমি
মুখার্জীবাবুকে বলে দিয়েছি সব রকমের ব্যবস্থা করে রাখার জন্য, আর আজকের রাত্রিটা এখনও বাকি। দেখা যাক! চল
এখন ঘরে চল, কাল সকাল সকাল বেরোতে হবে, এই বলে অর্ক ল্যাপটপ বন্ধ করতে শুরু করল।
পরেরদিন
সকালবেলায় আমরা দুজনে অর্কদের গাড়ি করে ব্যারাকপুরে মুখার্জীবাবুর কোয়ার্টারে
পৌঁছে দেখি সকলেই উপস্থিত হয়েছেন। মুখার্জীবাবু সুদর্শবাবুকেও হাজির করিয়েছেন
ওখানে অর্কর কথামত । অর্ক একেবারেই সময় নষ্ট না করে সুলগ্নাদেবীর মা’কে
উদেশ্য বলল, মাসিমা আপনাদের সাথে কথা বলে আমরা বুঝছি
সুলগ্নাদেবী ছোট থেকেই একটু লাজুক, মুখচোরা এবং
অন্তর্মুখী স্বভাবের ছিলেন। তাই তিনি একা একা সাজগোজ করতেই বেশী ভালোবাসতেন,
কিন্তু তবুও প্রসাধনীর মধ্যে ঠিক কোন জিনিশটা আপনার মেয়ের বেশী
পছন্দের ছিল, তা কি বলতে পারবেন? উত্তরে মাসিমা কিছু বলার আগেই দিওতমাদেবী বলে উঠলেন, সুলগ্না লিপস্টিক খুব ভালোবাসত। ওর ফেভারিট ছিল লিপস্টিক। অর্ক মাসিমার
দিকে তাকাতে মাসিমা ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন। অর্ক সাথে সাথে ওনাকে বলে উঠল, আর তাই বুঝি আদর করে আপনি আপনার কাছের বন্ধুকে “লিপস্টিক” বলে ডাকতেন? মিস বোস অবাক হয়ে অর্কর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে জিজ্ঞাসা করলেন ,
হ্যাঁ, কিন্তু তা আপনি কি করে জানলেন?
অর্ক
কোন জবাব না দিয়ে বলে উঠল,
আচ্ছা এবারে আমি একেবারে সোজাসুজি ঘটনায় যাই। আপনারা নিশ্চয়ই
জানেন যে সুলগ্না দেবী খুন হয়েছেন এবং ওনার পেটে বিষ পাওয়া গেছে। এক্ষেত্রে যে বিষ
ব্যবহার করা হয়েছে তা মোটেও সাধারণ বিষ নয়। এটাকে আমরা সাধারণত অ্যান্টিফ্রীজ বলে
জানি। গাড়ি ও গাড়ির ব্যবসা সম্পর্কিত মানুষেরা এটাকে ভালোভাবে চেনেন। এই বলে অর্ক
সুব্রতবাবুর দিকে ফিরে বলল – কি সুব্রতবাবু, ঠিক বলছি তো ?
জবাবে
কিছুটা থতমত খেয়ে সুব্রত বাবু বললেন – “হ্যাঁ, কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি কিছু জানি না এই ব্যাপারে”। অর্ক ওনার কথার কোন জবাব না দিয়ে বলে উঠল – যে
রাসায়নিক দিয়ে তরলের ফ্রীজীং পয়েন্ট কন্ট্রোল করা হয়, যাতে সেটা জমে যেতে না পারে, সেটাই হল
অ্যান্টিফ্রীজ, যার রাসায়নিক নাম ইথীলীন গ্লাইসল। এটা গাড়ির ইঞ্জীন ও রেডিয়েটর
কুলিং এর কাজে লাগে। এর স্বাদ
হল মিষ্টি, এই রাসায়নিকের কনসেনট্রেটেড পার্ট পেটে গেলে
মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত যদি না তৎক্ষণাত চিকিৎসা হয়। কিন্তু এর প্রভাব শরীরের উপরে
যতক্ষণে পরিলক্ষিত হয়, ততক্ষণে প্রায় সব শেষ। প্রথমে গা
বমি ভাব, পেটে ব্যথা এটা খাওয়ার চার থেকে ছয়ঘন্টা পরে
শুরু হয়, তার পর সাথে সাথে, প্রথমে
শ্বাসযন্ত্র, হার্ট ও শেষে কিডনি বিকল হয়ে মৃত্যু।
সুলগ্নাদেবীর ক্ষেত্রেও প্রায় একই রকম ভাবে ঘটেছে। সবই ঠিক আছে, কিন্তু এখানেও কিছু ধন্দ রয়ে গেছে। প্রথমে সুইসাইড ভাবা হলেও এখন আমরা
এখন সিওর ওটা হত্যা, কারণ বিষ পাওয়া গেলেও, কোন খাবার বা পানীয়তে তা পাওয়া যায় নি। সেটা পাওয়া গেছে ওনার ঠোঁটের
লিপস্টিকে। অভ্যাসবশত সেই বিষ ঠোঁট থেকে ওনার পেটে গিয়ে কাজ শুরু করে দেয়। কেউ বিষ
খেয়ে সুইসাইড করলে, সেটা খেয়ে নেবে, কিন্তু নিজের লিপস্টিকে কেন লাগিয়ে সুইসাইড করবে ? তাই না? তবে এক্ষেত্রে কিন্তু সন্দেহ সুদর্শন
বাবুর উপরেই প্রবল। আমি আড়চোখে একবার সুদর্শনবাবুর দিকে তাকিয়ে দেখে নিলাম।
ভদ্রলোক নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। অর্ক বলল, আমরাও
প্রথমে সুদর্শনবাবুর উপরে সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু এখন জানি উনি খুনটা করেননি ।
কথাটা
শোনার সাথে সাথে কেন জানি না, প্রিয়দর্শন বা ওনাদের পরিবারের সকলের
চেয়ে আমার বুকটা যেন বেশী হালকা হয়ে গেল বলে মনে হল। আমি অর্কর দিকে তাকাতে আমার
দিকে চোখ টিপে এবারে মিস দিওতিমা বোসের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কি মিস বোস, আপনার কি মনে হয় ? অ্যান্টিফ্রীজ সম্পর্কে আমি যা যা বললাম তা ঠিক তো ? জবাবে উনি রেগে বাঁজখাই গলায় বলে উঠলেন, “আমি
কি করে জানব ? আমার যা মনে হবার আমি আগেই জানিয়েছি
আপনাদের”। অর্ক হেসে বলে উঠল, “তা
ঠিক, কিন্তু তাও তো
সেদিনকে দেখলাম আপনি জানেন যে লিপস্টিকের মধ্যে ইথীলীন গ্লাইসল মিশিয়ে দিলে, সেটা
দিয়ে আপনার এতদিনের বন্ধু,
না, বন্ধু না, গার্লফ্রেণ্ডকে
মেরে আপনাকে বিট্রে করার শাস্তি দেওয়া যায় !” কথাটা শোনার
পরেই যেন চোখটা জ্বলে উঠল ওনার, বাঁজখাই চিৎকার করে বললেন,
“হোয়াট রাবিশ? কি যা তা বলছেন আপনি ?
মনগড়া কথা বললেই হল ? আমি কেন খুন করব
আমার বান্ধবীকে ? যতসব ফালতু কথা। এসব কথার কোন জবাব আমি
দেব না”।
মিঃ
মুখার্জী বলে উঠলেন,
গার্লফ্রেন্ড? মানে ? অর্ক শান্ত ভাবে বলল, প্রতারণার শাস্তি দিতে,
মুখার্জী বাবু, নিজের লেসবিয়ান
গার্লফ্রেন্ডকে কিছুতেই অন্য কারোর সাথে বিয়ে তো দূরের কথা, সম্পর্কও করতে দিতেন না দিওতিমা দেবী। নিজেই আগের দিন জেরার সময়ে
জানিয়েছিলেন। সুলগ্নাদেবী আসলে ওনার লেসবিয়ায়ন পার্টনার ছিল, বিয়ের আগে, কিন্তু পারিবারিক চাপে হোক বা বিয়ে
করার লোভে হোক, ওনার এখানে না থাকার সুবিধে নিয়ে সুলগ্না
দেবী বিয়ে করে ফেলেন। তাই প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে এই শাস্তির বিধান মনে মনে ভেবে
নিয়ে দিওতিমা দেবী দেখা করতে আসেন ওনার সাথে ওনার শ্বশুরবাড়িতে একদিন বিকেলবেলায়।
ওনাকে দেখে সুলগ্নাদেবী চমকে গেলেও, ওনাকে এই বলে আশ্বস্ত
করেন যে উনি এই বিয়েতে খারাপ কিছু ভাবেননি, আর তাই
সেইদিনই সুলগ্নাদেবী ওনাকে আমন্ত্রণ করে বসেন রবিবারের অনুষ্ঠানের জন্য।
সুলগ্নাদেবী স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি যে এরকম একটা সুযোগই দিওতিমা খুঁজছেন এতদিন
ধরে। আর তাই সেদিনকেই সেই বিষ মাখানো লিপস্টিক উপহার দিলেন নিজের প্রেমিকাকে কারণ
একমাত্র সুলগ্নাদেবীর বাড়ির লোক ছাড়া একমাত্র দিওতিমা দেবীই জানতেন সুলগ্নাদেবীর
লিপস্টিকের উপরে আলাদা দুর্বলতা আছে। সে বিষাক্ত লিপস্টিক ঠোঁটে লাগাতেই, বিষ কিছুটা মুখ থেকে সোজা পেটে। আর তারপরে ইথীলীন গ্লাইসন আর লিপস্টিকে
থাকা সীসার যৌথকার্যক্রমে অতি দ্রুত মৃত্যু ঘটে ওনার। আর ইথীলীন গ্লাইসল আপনি খুব
সহজেই আপনাদের গাড়ির ওয়ার্কশপ থেকে জোগাড় করেছিলেন। কি তাইতো মিস ডিওডোরান্ট?
অর্কর শেষের কথাটায় আমি ছাড়া আর একজন ছিলেন, যিনি সবচেয়ে বেশী চমকে উঠলেন তিনি হলেন বিমলবাবু।
অর্ক
শেষ করতেই দিওতিমা ফুঁসতে ফুঁসতে বলে উঠলেন, যা খুশি গল্প দিলেই হল
নাকি ? কি প্রমাণ আছে আপনার কাছে শুনি ? অর্ক হেসে বলল, “আপনি কি করে জানলেন যে,
যে লিপস্টিক দিয়েই খুনটা করা হয়েছে ? সোমবার
অসাবধানতাবশত আপনার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। আপনি জানেন, কারণ
আপনিই কাজটা করেছেন। সোমবারের জেরার রেকর্ডিং আছে আমাদের কাছে। এছাড়াও আমার কাছে
সব ধরণের প্রমাণ আছে, যে আপনারা দুজনে লেসবিয়ান ছিলেন,
এই ব্যাপারে আপনাদের স্কুল ও কলেজের বন্ধুদের স্বীকারোক্তিও
পুলিশ জোগাড় করে ফেলেছে। সবচেয়ে বড় কথা, আপনার ও সুলগ্না
দেবীর আপত্তিকর অবস্থার কিছু সেলফি আছে সুলগ্নাদেবীর ফোনে হাইড করা, যা আমি বিশেষ সফটওয়ারের মাধ্যমে পাসওয়ার্ড ব্রেক করে কালরাত্রে খুঁজে
পেয়েছি। সব জায়গায় আপনাকে সবসময়ে ছেলেদের ড্রেস পরে দেখা গিয়েছে, আর ওনাকে শুধুমাত্র আপনার পছন্দমত ড্রেস পড়া অবস্থায় । এছাড়া আরো একটা
অকাট্য প্রমাণ কাল রাত্রে আমি পেয়েছি। সুলগ্নাদেবীর মোবাইলের হোয়াটসআপের চ্যাটিং
স্ট্রিং। দিওতিমা নামটা সেখানে সেভ করা হয় ডিওডোরান্ট নামে, দিও হয়ে যায় ডিও আর নাম হয়ে যায় ডিওডোরান্ট । আর আপনার পাঠানো মেসেজ
থেকে দেখেছি আপনিও ওনাকে লিপস্টিক বলেই ডাকতেন। এর আগেই আপনি নিজের মুখে সেকথা
স্বীকার করেছেন। যদিও এগুলো প্রেমের নাম, তবুও ডিওডোরান্ট
নামটা ছেলেদের ও লিপস্টিক নামটা মেয়েদেরকেই সূচক করে। আর তাই সুলগ্নাদেবী
সমকামিতার সম্পর্কে আপনার প্রেমিকা ছিলেন আর আপনি ছিলেন ওনার প্রেমিক। আমি সিওর
আপনার মোবাইলেও ব্যক্তিগত সিমে ওনার নাম সেভ আছে “লিপস্টিক”
বলে, যদি না আপনি এখন ডিলিট করে দেন,
আর কিছু ফটো আপনার মোবাইলেই পাওয়া যাবে। সেদিন বিমলবাবু
সুলগ্নাদেবীকে আপনার উদ্দেশ্যেই বলা ঐ কথাগুলো শুনতে পেয়েছিলেন। উনিও একজন সাক্ষী
বটে এই কেসটার। কই দিন আপনার ফোনটা দিন দেখি ! এই বলে
অর্ক দিওতিমার ফোনটা চাইল।
দিওতিমা
বোস হঠাৎ করে চুপ করে গেলেন। মিঃ মুখার্জীর অনুগত মহিলা উর্দিধারীরা ততক্ষণে ওনাকে
ঘিরে ধরেছেন। ওনার চোখ থেকে জল গড়িয়ে এল। ধরা পড়ে গিয়েছেন ওনার পার্স থেকে ফোনটা
বার করে পুলিশের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হলেন ওনার সেই বাঁজখাই গলা পুরো মিইয়ে দিয়ে
যা বললেন,
তা হল, ওনার সাথে সুলগ্নাদেবীর সম্পর্ক
প্রায় দশবছরের উপরে। স্বাভাবিক বন্ধুত্ত্ব দিয়ে শুরু হলেও, সুলগ্নাদেবীর অসাধারণ সৌন্দর্য্যর প্রতি তিনি সেই থেকেই এক আলাদা
আকর্ষণ অনুভব করতেন। পরে দুজনে নিজেরাই আবিষ্কার করেন যে একে অপরের প্রেমে পড়ে
গেছেন। সুলগ্নাদেবী নিজে যেহেতু খুব চাপা স্বভাবের ছিলেন, তাই ঘুণাক্ষরেও কাউকে জানতে দেননি এই ব্যাপারটার কথা। তবে শেষের দিকে
তিনি আর এসমস্ত কিছু আর পছন্দ করতেন না, ওনার বিয়ের সম্বন্ধ
দেখা শুরু হয়েছিল, তাই উনিও চেয়েছিলেন যাতে বিয়ের পরে
নিজের একটা পরিপাটি ও গুছানো সংসার হয়। কিন্তু বাধ সেধেছিলেন দিওতিমা বোস। উনি
কিছুতেই চাননি ওনার প্রিয় লিপস্টিককে নিজের কাছ থেকে আলাদা করতে আর সেই
টানাপোড়েনের মধ্যেই ওনার এখানে না থাকার সুযোগ নিয়ে লোভের বশে সুলগ্নাদেবী বিয়ে
করে ফেলেন সুদর্শনবাবুকে আর ফিরে এসে সেই ধোঁকার কথা শুনে হত্যার পরিকল্পনা করে
ফেলেন উনি। কিন্তু বিয়ে হয়েও সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকতেন নিজের স্বামীর কাছে আগের
সম্পর্ক ধরা পড়ে যাবার আশঙ্কায়। তাই বিয়ে করেও শান্তি পেলেন না সুলগ্নাদেবী,
প্রকৃত স্বামী-স্ত্রী হয়ে উঠতে পারেন নি
তারা কোনোদিন।
এতদূর
শুনে মাসিমা বিস্মিত ভাবে চেয়ে বললেন, কিন্তু অর্কবাবু আমরা
ঘুণাক্ষরেও বুঝিনি এরকম কিছু ওদের দুজনের মধ্যে চলছে। ওরা সবসময় ঘরের দরজা বন্ধ
করে নিজেদের মধ্যে গল্প করত। আমাদের মেয়েও আমাদেরকে কিছু বলে নি। বিয়ের আগেও তো এই
ব্যাপারে কিছু বলতে পারত । অর্ক জবাবে খালি এটুকুই বলল, আমার
মনে ভয়ে বা লজ্জায় কিছু বলতে পারেন নি উনি আপনাদের। আর সুলগ্নাদেবীর উপরে এতটাই
পসেসিভ ছিল মিস বোসের ভালোবাসা, যে ওনাকে নিজের কাছছাড়া
করার কথা ভাবতেও পারতেন না, অপরদিকে সুলগ্নাদেবী চাইতেন
বিয়ে করে সাধারণ জীবনযাপন করতে। এর মধ্যেই পুলিশের লোক হাতে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে গেল
মিস ডিওডোরান্ট থুড়ি, দিওতিমা বোসকে।
এতক্ষণে
মিঃ মুখার্জী জিজ্ঞাসা করলেন, অর্ক, আপনার
সন্দেহ কিভাবে পড়ল ওনার উপরে ? জবাবে অর্ক বলল, প্রথম সন্দেহ আমার তখন যায়, যখন শুনি উনিই জোড়
করে চাপ দিয়ে সুদর্শনবাবুর নামে পুলিশে অভিযোগ করান, তারপরে
মিথ্যে কথা বলেন যে রবিবার রাত্রেই উনি প্রথম সুলগ্নাদেবীর সাথে দেখা করতে
গিয়েছিলেন, কারণ পারমিতাদেবী আমাকে ওনার আগেও একদিন যাবার
কথা বলেছিলেন। তারপর কালকে আবেগের বশে নিজেই লিপস্টিকের কথাটা বলে ফেলাতে আমার আরও
সন্দেহ পড়ে ওনার উপরে। তারপরে, গতকাল ওনাদের গাড়ির
ওয়ার্কশপের ব্যবসা আর সেখানে অ্যান্টিফ্রীজের ব্যবহার নিজের চোখে দেখে আর শেষে,
সুলগ্নাদেবীর ফোন আমার সমস্ত সন্দেহ দূর করে দেয় ওনাদের
সম্পর্কের ও সম্পর্কের ইতির ব্যাপারে। যাই হোক মিঃ মুখার্জী আমাদের কাজ শেষ,
সুদর্শনবাবু কিছুই করেননি, সত্যি তিনিই
পারিপার্শ্বিকতার শিকার হয়েছেন এক্ষেত্রে। এই বলে আমার দিকে ফিরে ও বলে উঠল,
চল এবারে আমরা উঠি।
ফিরে
আসার সময়ে আমি অর্ককে জিজ্ঞাসা করলাম, “আচ্ছা, এই গল্পটার নাম কি দেওয়া যায় বলতো ?” অর্ক
হেসে বলে উঠল, লেখ “লিপস্টিক ও
ডিওডোরান্ট এর গল্প”।
(সমাপ্ত)
No comments:
Post a Comment